আগরতলা, ২৯ অক্টোবর : ত্রিপুরার চা বাগানগুলির জমি অধিগ্রহণের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। চা বাগানের জমি সুরক্ষিত রাখতে কঠোর আইন রয়েছে এবং সেই আইনের বাইরে গিয়ে সরকার কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। বৃহস্পতিবার আগরতলা টি অকশন সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট ভাষায় একথা জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। একই সঙ্গে তিনি জানান, রাজ্যের যে সমস্ত জমিতে চা বাগান গড়ে তোলা সম্ভব নয়, সেগুলিকে অন্য শিল্পের প্রসারে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি চা বাগানকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার।
বৃহস্পতিবার গোর্খাবস্তিতে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহার হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল আগরতলা টি অকশন সেন্টার। এই নিলাম কেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার চা শিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, আগরতলা টি অকশন সেন্টার চালুর ফলে সারা বিশ্বের কাছে ত্রিপুরার চায়ের পরিচিতি পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজ্যের চা শিল্পকে আরও সংগঠিত করা, বাজার সম্প্রসারণ এবং চায়ের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পথ প্রশস্ত হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা, ত্রিপুরা টি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর-সহ সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিক ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানে রাজ্যের চা শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, চা বাগানগুলির উন্নয়ন এবং এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের চা বাগানগুলির দীর্ঘদিনের রুগ্ন দশা কাটিয়ে শিল্পটিকে নতুন করে চাঙ্গা করতে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বর্তমানে ত্রিপুরায় মোট ৫৪টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চা বাগান সরাসরি পরিচালনা করছে ত্রিপুরা টি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বা টিটিডিসি। আরও ১৫টি চা বাগান পরিচালিত হচ্ছে সমবায় সমিতির মাধ্যমে। বাকি চা বাগানগুলিও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিচালনায় রয়েছে। এই চা বাগানগুলির উৎপাদন ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে চা শিল্পকে লাভজনক করে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
শুধু চা উৎপাদন বাড়ানোই নয়, চা বাগানগুলির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। চা শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন, তাঁদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং চা শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, রাজ্যের চা শিল্পকে শুধুমাত্র একটি উৎপাদনভিত্তিক ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে সরকার।
এদিকে, চা বাগানের জমি অন্য শিল্পে হস্তান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে, সেই প্রসঙ্গেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চা বাগানের জমি দখল করার কোনও উদ্দেশ্য সরকারের নেই। চা বাগান তৈরির জন্য যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেই জমির মধ্যে যেখানে চা চাষ করা সম্ভব নয়, সেগুলিকে অন্য শিল্পের প্রসারে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় জমি সংক্রান্ত আইন ও বিধিনিষেধ মেনেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
চা বাগানকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, রাজ্যের চা বাগানগুলিতে পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে টি-ট্যুরিজম বা চা পর্যটন গড়ে তোলা গেলে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর ফলে চা বাগান এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। চা শিল্প, পর্যটন এবং অন্যান্য শিল্পের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে রাজ্যের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরা টি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অধীনস্থ সমবায় ও অন্যান্য চা বাগানের প্রায় ১২০০ একর জমি বেসরকারি অথবা অন্য শিল্পের কাজে হস্তান্তর করা হতে পারে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে চা বাগানের জমি অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে জমি সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি, অন্যদিকে চা চাষের অনুপযোগী জমিকে শিল্পের কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন।
সব মিলিয়ে, আগরতলা টি অকশন সেন্টারের সূচনার মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার চা শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার পাশাপাশি চা বাগানগুলির উন্নয়ন, শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অগ্রগতি এবং টি-ট্যুরিজমের বিকাশে নতুন দিশা দেখাতে চাইছে রাজ্য সরকার। তবে চা বাগানের জমি নিয়ে চলমান আলোচনা ও গুঞ্জনের আবহে সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

