আগরতলা, ২৯ অক্টোবর : আর্থিকভাবে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির পাকা বাড়ির স্বপ্নপূরণে আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পে আরও এক ধাপ অগ্রগতি হল। আখাউড়া বর্ডার সংলগ্ন এলাকায় প্রকল্পের ‘এ’ ও ‘এফ’ ব্লকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। এই পর্যায়ে ২৭৮টি আবাসন ভোক্তাদের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। বৃহস্পতিবার নবনির্মিত ব্লক দুটি পরিদর্শনের পর ডিজিটাল মাধ্যমে উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে কয়েকজন ভোক্তার হাতে নতুন আবাসনের চাবি তুলে দেন তিনি। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আর্থিকভাবে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাধারণ মানুষের পাকা বাড়ির স্বপ্নপূরণ এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে লাইট হাউস প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একটি পাকা বাড়ি শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং একটি পরিবারের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ভিত্তি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পে মোট এক হাজারটি আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সাতটি ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকের উদ্বোধন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বাকি ব্লকগুলির কাজও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করে ভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা দেখা দিলেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় সেই সমস্যাগুলি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। প্রকল্পের সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের সহযোগিতার জন্য ত্রিপুরাবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্নের প্রকল্পগুলির অন্যতম লাইট হাউস প্রকল্প উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত, উন্নতমানের, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। দেশের ছয়টি শহরের সঙ্গে আগরতলাকেও এই প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিকে স্থায়ী আবাসন দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জীবনে নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রকল্পের আবাসনগুলির নির্মাণপ্রযুক্তি সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ৩০ বর্গমিটার বা ৩২০ বর্গফুট। আধুনিক ‘লাইট গেজ স্টিল ফ্রেম’ প্রযুক্তিতে নির্মিত এই আবাসনগুলি উন্নত নির্মাণপদ্ধতি, স্থায়িত্ব ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত। বড় বড় শহরেও সাশ্রয়ী মূল্যে এই ধরনের আধুনিক আবাসন পাওয়া কঠিন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লাইট হাউস প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সেই সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আবাসন নির্মাণের পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উপরও গুরুত্বারোপ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি পরিকল্পিত আবাসন এলাকা গড়ে তুলতে উন্নত পরিকাঠামোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, সুস্থ পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও জরুরি। যাঁরা এই আবাসনগুলিতে বসবাস করবেন, তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে এলাকাটিকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘এ’ ও ‘এফ’ ব্লকের উদ্বোধন আগরতলায় আধুনিক ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে ২৭৮টি পরিবারের জন্য নতুন আবাসনের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রাজ্যের নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতীতে ত্রিপুরা সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা কাটিয়ে বর্তমানে রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ গড়ে উঠেছে বলে তিনি দাবি করেন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীরা রাজ্যে আসছেন এবং উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্য সরকার একদিকে যেমন সরকারি ক্ষেত্রে নিয়মিত চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজ্যে ২৩ হাজারেরও বেশি নিয়মিত চাকরি দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার বলেন, আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পের দুটি ব্লকের উদ্বোধন শুধু আবাসন নির্মাণের একটি পর্যায় সম্পন্ন হওয়া নয়, বরং ২৭৮টি পরিবারের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পাকা বাড়ির স্বপ্নপূরণের মধ্য দিয়ে পরিবারগুলি আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে ‘গ্লোবাল হাউসিং টেকনোলজি চ্যালেঞ্জ ইন্ডিয়া’ শুরু হয়। আধুনিক, টেকসই, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত উন্নতমানের আবাসন তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। দেশের বিভিন্ন শহরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্মাণক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পও সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পে আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির পাশাপাশি কমিউনিটি সেন্টার, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জল সরবরাহ এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত আলোর মতো বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে আবাসনগুলিকে প্রয়োজনীয় পরিষেবাসম্পন্ন পরিকল্পিত এলাকায় পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নগর উন্নয়ন দফতরের সচিব ড. মিলিন্দ রামটেকে। তিনি প্রকল্পের গুরুত্ব এবং আবাসন পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আগরতলা পুর নিগমের কমিশনার মিহির কান্তি গোপ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব কিরণ গিত্তে, বিএমটিপিসির নির্বাহী অধিকর্তা অরবিন্দ কুমার-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

