আগরতলা, ২৯ অক্টোবর : বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষার সঠিক বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষকদের ন্যূনতম মজুরি প্রদান-সহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিল অল ত্রিপুরা স্কুল কম্পিউটার শিক্ষক সংঘ। আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে জেলা স্তর থেকে রাজ্য স্তর পর্যন্ত ধাপে ধাপে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছে সংগঠন। প্রয়োজনে গণইস্তফা দিয়ে আন্দোলনের ময়দানে নামারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষার প্রসারের পরিবর্তে গোটা ব্যবস্থাকে ব্যবসায়িক মনোভাবের ভিত্তিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধ করে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার আগরতলা প্রেস ক্লাবের সামনে সমবেত হন সংগঠনের সদস্যরা। পরে বিদ্যালয় শিক্ষা দফতরের সচিব এবং রাজ্য প্রকল্প অধিকর্তার কাছে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরে ডেপুটেশন প্রদান করেন তাঁরা। সংগঠনের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা ও কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অথচ বিদ্যালয় স্তরে কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য তাঁরা এ পর্যন্ত আটবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এবার আন্দোলনের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দাবি পূরণের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ না করা হলে ১০ নভেম্বর থেকে আন্দোলন শুরু হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন সংগঠনের নেতৃত্ব।
সংগঠনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ৩৬৫ জন কম্পিউটার শিক্ষকের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের পুনরায় প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে বা পুনরায় প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, কম্পিউটার শিক্ষাকে নিছক একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে এই কাজে যুক্ত প্রশিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
অল ত্রিপুরা স্কুল কম্পিউটার শিক্ষক সংঘের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের নামে ব্যবসায়িক মনোভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, কম্পিউটার শিক্ষা বর্তমান সময়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং ভবিষ্যতের কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিদ্যালয় স্তর থেকেই কম্পিউটার শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তাই এই ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে শিক্ষার স্বার্থে পরিচালনা করা উচিত। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষকদের ন্যূনতম মজুরি প্রদানও নিশ্চিত করতে হবে।
এদিনের ডেপুটেশনে সংগঠনের সদস্যরা তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের আবেদন জানান। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার শিক্ষার প্রসারে কাজ করার পরও যদি প্রশিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তবে এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাই আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে দাবিগুলি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সংগঠন।
প্রসঙ্গত, সংগঠনের দাবি, অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যেও একসময় একই ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষা চালু ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলি কম্পিউটার শিক্ষকদের সরকারি তত্ত্বাবধানে নিয়ে এসেছে বলে তাঁদের বক্তব্য। প্রতিবেশী অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার উদাহরণও তুলে ধরেছেন তাঁরা। সংগঠনের প্রশ্ন, অন্যান্য রাজ্যে যদি এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হয়ে থাকে, তবে ত্রিপুরায় কেন তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না?
সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, ত্রিপুরাতেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কম্পিউটার শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই এবার শুধু ডেপুটেশন বা আবেদন-নিবেদনের মধ্যে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তাঁরা। দাবি পূরণ না হলে গণইস্তফার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি জেলা থেকে রাজ্য স্তর পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এখন দেখার, ১০ নভেম্বরের আগে রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট দফতর স্কুল কম্পিউটার শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অন্যথায় বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষকদের আন্দোলন আগামী দিনে আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

