আগরতলা, ৭ সেপ্টেম্বর : ত্রিপুরায় স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন এবং ‘স্বাস্থ্য বিপ্লব’-এর কথা জোরের সঙ্গে বলা হলেও রাজ্যের প্রধান রেফারেল হাসপাতাল জিবিপি হাসপাতাল তথা এজিএমসি-তে রোগীদের জন্য ন্যূনতম পরিষেবা নিয়েই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। হাসপাতালের আউটডোরে হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচারের অভাবে রোগীদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। এমনকি সোমবার এক রোগীকে বসার টুলের উপর ভর করে চিকিৎসকের কক্ষের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামনে এসেছে। ঘটনায় হাসপাতালের পরিষেবা ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি জিবিপি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও ফ্যাকাল্টিদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এর পর থেকে হাসপাতালে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। কিন্তু সেই অনুপাতে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিকাঠামো এবং পরিষেবা কতটা বাড়ানো হয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সোমবার জিবিপি হাসপাতালের আউটডোরে দেখা যায়, জনৈক রোগী স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছেন না। তাঁকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে অথবা স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বসার টুলের উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চিকিৎসকের কক্ষের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই দিনে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত আরও এক রোগীকেও অত্যন্ত কষ্ট করে আউটডোরে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
পরিস্থিতির কথা জানাতে গিয়ে ওই রোগীর পরিজন জানান, তিনি একাই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। রোগীর চলাফেরার ক্ষমতা না থাকায় তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হুইলচেয়ার কিংবা স্ট্রেচার চেয়েছিলেন। কিন্তু তা পাননি বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি হাসপাতালের বেশ কয়েকজনের কাছে সাহায্য চেয়েও সাড়া পাননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বসার টুলের উপর ভর দিয়ে রোগীকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে।
ওই রোগীর পরিজনের বক্তব্য, রাজ্যের প্রধান রেফারেল হাসপাতাল জিবিপি-তে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচার থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ, আহত কিংবা চলাফেরায় অক্ষম রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরিষেবা ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাই কার্যত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ঘটনাকে ঘিরে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। জিবিপি হাসপাতালের রোগীদের ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, বিধায়ক ও সাংসদরা তাঁদের সরকারি তহবিল থেকে হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচার প্রদান করেছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের জন্য সরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বলে জানা যায়। তাহলে রোগীর প্রয়োজনে সেগুলি কেন পাওয়া যাচ্ছে না—এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, হাসপাতালে হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচারের মতো মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রোগীদের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে একটি হুইলচেয়ার বা স্ট্রেচার পাওয়ার জন্যও তাঁদের একাধিক জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকেই অতিরিক্ত শারীরিক কষ্টের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এদিন এই বিষয়ে হাসপাতালের মেডিকেল সুপার বিধান গোস্বামী এবং আরএমও বিশ্বজিৎ দেববর্মার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। ফলে হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচারের ঘাটতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
রাজ্যে একদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার আধুনিকীকরণ, মেডিকেল হাব গঠন এবং উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো তৈরির কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজ্যের প্রধান রেফারেল হাসপাতালেই যদি একজন চলাফেরায় অক্ষম রোগীকে বসার টুলে ভর করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, তাহলে সেই ‘স্বাস্থ্য বিপ্লব’-এর বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল।
হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচারের মতো রোগীদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলি কোথায় রয়েছে, কেন সেগুলি রোগীদের প্রয়োজনে মিলছে না এবং হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা বিষয়টি সম্পর্কে কতটা অবগত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন দাবি করছে রোগী ও তাঁদের পরিজনরা।

