আগরতলা, ২৩ জুন : হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ও লোকায়ত উৎসব অম্বুবাচি উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার রাজধানী আগরতলার ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ি মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে উৎসবকে ঘিরে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। স্বামী, সংসার ও সমাজের কল্যাণ কামনায় তাঁরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। ভক্তি, বিশ্বাস ও আনন্দের এক অনন্য আবহে মুখর হয়ে ওঠে গোটা মন্দির প্রাঙ্গণ।
তিথি অনুসারে সোমবার রাত থেকেই শুরু হয়েছে অম্বুবাচি উৎসব। ২০২৬ সালের অম্বুবাচি পর্ব শুরু হয়েছে ২২ জুন (৭ আষাঢ়) এবং শেষ হবে ২৬ জুন (১১ আষাঢ়)। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি অম্বুবাচি, অমাবতী বা রজঃউৎসব নামেও পরিচিত।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় ধরিত্রী বা পৃথিবী মাতার ঋতুকাল চলে। শাস্ত্র ও পুরাণে পৃথিবীকে ‘ধরিত্রী মাতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অম্বুবাচি পর্বে ধরিত্রী মাতার সৃজনশক্তির নবজাগরণ ঘটে এবং এর পরেই প্রকৃতি নতুন করে উর্বরতা লাভ করে। সেই কারণেই কৃষিনির্ভর সমাজে এই উৎসবের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, অম্বুবাচির পর প্রকৃতি যেমন শস্য-শ্যামলায় ভরে ওঠে, তেমনি মানুষের জীবনেও সুখ, সমৃদ্ধি ও শুভ শক্তির আগমন ঘটে।
মঙ্গলবার লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ি মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মন্দিরে পুজো-অর্চনার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার। বিবাহিত মহিলারা ঐতিহ্য মেনে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও পারিবারিক সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, অম্বুবাচির সময় পরানো সিঁদুর অক্ষয় সৌভাগ্যের প্রতীক এবং দাম্পত্য জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে।
মন্দিরে আগত জনৈক মহিলা ভক্ত জানান, “প্রতিবছরের মতো এবারও আমি লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়িতে এসেছি। স্বামী, সন্তান, পরিবার ও সমাজের মঙ্গল কামনায় পুজো দিয়েছি। সবার সঙ্গে সিঁদুর খেলায় অংশ নিয়েছি। এই বিশেষ দিনের জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি।”
শুধু লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়িই নয়, রাজধানীর অন্যান্য দেবতা মন্দির ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলিতেও অম্বুবাচি উপলক্ষ্যে ভক্তদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয় উৎসবটি।
ধর্মীয় বিশ্বাস, নারীত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রকৃতির উর্বরতা এবং পারিবারিক মঙ্গল কামনার বার্তা নিয়ে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে অম্বুবাচি। আধুনিকতার যুগেও এই উৎসব মানুষের হৃদয়ে একইভাবে আবেগ, আস্থা ও ঐতিহ্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে চলেছে।

