শান্তিরবাজার, ১০ সেপ্টেম্বর : ব্রু রিয়াং সম্প্রদায়ের অটুট বিশ্বাস, স্বতন্ত্র পরিচয় এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী সংগ্রঙমা পূজা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই পূজা পূর্বপুরুষের শিকড়, লোকবিশ্বাস ও প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের যোগসূত্র আরও দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৃহস্পতিবার শান্তিরবাজার মহকুমার মনুবাজারের দখলসিং রিয়াং পাড়ায় ঐতিহ্যবাহী সংগ্রঙমা মন্দির প্রাঙ্গণে দু’দিনব্যাপী ২৫তম রাজ্যভিত্তিক সংগ্রঙমা পূজা ও উৎসবের উদ্বোধন করে এই মন্তব্য করেন রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, শান্তিরবাজার মহকুমা প্রশাসন এবং ক্র (রিয়াং) সংগ্রঙমা মথ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবকে ঘিরে এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল বলেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলি শুধু কোনও একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে না, এগুলি ভারতের বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ কৃষ্টি-সংস্কৃতিরও পরিচয় বহন করে।
ব্রু সম্প্রদায়ের নিজস্ব লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান রাজ্যপাল। তিনি বলেন, ব্রু সম্প্রদায়ের লোককথা, লোকগীতি, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রথাগত জ্ঞান নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এর ফলে বর্তমান প্রজন্ম যেমন নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকবে।
রাজ্যপাল আরও বলেন, ত্রিপুরার অন্যতম জনজাতি জনগোষ্ঠী হিসেবে ব্রু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি রাজ্যের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলে জনজাতি অংশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সচেতনতা এবং যুবসমাজের উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জনজাতি অংশের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে রাজ্যপাল নবোদয় বিদ্যালয় ও একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ কাজে লাগানোর উপর জোর দেন। তিনি বলেন, শিক্ষাই আগামী প্রজন্মকে আত্মনির্ভর ও সক্ষম করে তুলতে পারে। পাশাপাশি যুবক-যুবতীদের নেশা থেকে দূরে থাকার জন্যও আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য সচেতনতার উপরও গুরুত্ব আরোপ করেন রাজ্যপাল। সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বিশেষ করে টিবিমুক্ত ভারত গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আবেদন জানান তিনি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ব্রু সম্প্রদায়ের কাস্কাউ খবা রিয়াং, রাই আমিঞ্জয় রিয়াং, ক্র সংগ্রঙমা মথ-এর সভাপতি বীরেন্দ্র রিয়াং, বিএসএম-এর সভাপতি গ্যাব্রিয়েল রিয়াং, সমাজসেবী হরেন্দ্র রিয়াং-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাগত ভাষণ দেন ক্র সংগ্রঙমা মথ-এর সাধারণ সম্পাদক খনারাম রিয়াং। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগ্রঙমা পূজা ও উৎসব কমিটির সভাপতি পানেন্দ্র রিয়াং।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই অতিথিরা মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রদর্শনী স্টল ফিতা কেটে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করেন। পরে তাঁরা সংগ্রঙমা দেবীর মন্দিরে গিয়ে পূজার্চনায় অংশ নেন। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসব প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও আয়োজন করা হয়েছে।
দু’দিনব্যাপী এই রাজ্যভিত্তিক উৎসবে ব্রু রিয়াং সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন জনজাতি জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা অংশগ্রহণ করবেন। তাঁদের পরিবেশনায় লোকনৃত্য, লোকগীতি ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ফলে সংগ্রঙমা পূজার রজতজয়ন্তী শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, জনজাতি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক মিলনমঞ্চ হিসেবেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

