আগরতলা, ১৭ আগস্ট : শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারকে ঘিরে এদিন ভোর থেকেই শিব আরাধনায় মেতে উঠল রাজধানী আগরতলা। গভীর রাত থেকেই কাঁধে ভার নিয়ে বিভিন্ন পবিত্র জলাশয় ও নদীর ঘাটে সমবেত হন শিবভক্তরা। সেখান থেকে জল সংগ্রহ করে রাজধানীর বিভিন্ন শিবমন্দিরে গিয়ে মহাদেবের অভিষেক ও বিশেষ পূজার্চনায় অংশ নেন তাঁরা। ভক্তদের সমাগম, শঙ্খধ্বনি ও মুহুর্মুহু ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে এদিন রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
পুরাণ ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রাবণ মাস দেবাদিদেব মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয়। আর এই মাসের সোমবার শিব আরাধনার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন ভক্তরা। সেই কারণে শ্রাবণের শেষ সোমবারে শিবভক্তদের মধ্যে আলাদা উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়। প্রতিবছরের মতো এবছরও সেই ঐতিহ্য মেনে রাত জেগে জল সংগ্রহ করে মহাদেবের মাথায় জল ঢালেন হাজার হাজার ভক্ত।
রবিবার গভীর রাত থেকেই রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিবভক্তরা ভার কাঁধে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল চতুর্দশ দেবতা মন্দির সংলগ্ন হাওড়া নদীর পবিত্র ঘাট। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভক্তদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে প্রবীণ ভক্তদের উপস্থিতিতে ঘাট চত্বর কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে জল সংগ্রহের পর ভক্তরা নির্দিষ্ট নিয়ম ও ভক্তিভরে সেই জল নিয়ে নিজ নিজ এলাকার শিবমন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কাঁধে ভার, মুখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি এবং শিবনামের সঙ্গে তাঁদের এই জলযাত্রা রাজধানীর রাজপথেও তৈরি করে এক ভিন্ন আবহ। পরে মন্দিরে পৌঁছে সেই জল দিয়ে মহাদেবের অভিষেক করেন তাঁরা।
শ্রাবণের শেষ সোমবার উপলক্ষ্যে শুধু চতুর্দশ দেবতা মন্দির সংলগ্ন হাওড়া নদীর ঘাটেই নয়, রাজধানীর লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ির দীঘির ঘাট এবং হাওড়া নদীর বিভিন্ন ঘাটেও শিবভক্তদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোর থেকে ঘাটগুলিতে ভক্তদের আনাগোনা অব্যাহত থাকে।
এদিন রাজধানীর বটতলা শিববাড়িতেও সকাল থেকেই ভক্তদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়। মন্দিরে পুজো দিতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন। মন্দিরের পুরোহিত কেশব চক্রবর্তী জানান, রবিবার গভীর রাতে ব্রহ্মমুহূর্ত থেকেই ভক্তদের জল আনয়ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সোমবার সারাদিন ধরে মন্দিরে ভক্তদের শিব আরাধনা ও পূজার্চনা চলে।
ভক্তদের কথায়, শ্রাবণের শেষ সোমবার তাঁদের কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং পরিবারের সুখ-শান্তি, স্বামী-পরিবারের মঙ্গল, দেশ ও দশের কল্যাণ কামনায় মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানানোর বিশেষ দিন। সেই বিশ্বাস ও ভক্তি থেকেই প্রতিবছর এই দিনে তাঁরা জল এনে মহাদেবের অভিষেক করেন।
সব মিলিয়ে শ্রাবণের শেষ সোমবারে রাজধানীজুড়ে ছিল শিবময় পরিবেশ। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাঁধে ভার নিয়ে পথে নামা ভক্তদের সারি এবং মন্দিরে মন্দিরে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি জানান দেয়—শ্রাবণের শেষ প্রহরেও অটুট রয়েছে ত্রিপুরার শিবভক্তির সেই চিরন্তন ঐতিহ্য।

