কুমারঘাট , ১১ মে : তীব্র গরমে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, তখনও গ্রামবাংলার বহু ঘরে শীতলতার সহজ ও ঐতিহ্যবাহী ভরসা হয়ে টিকে আছে হাতপাখা। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎচালিত পাখার দাপটে হারিয়ে যেতে বসা এই প্রাচীন শিল্পকে আজও বাঁচিয়ে রাখার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ঊনকোটি জেলার ফটিকরায় সরদারপাড় এলাকার বাসিন্দা রিনা দেবনাথ।
ষাটোর্ধ্ব রিনা দেবনাথ ছোটবেলা থেকেই হাতপাখা তৈরির কাজ শিখেছেন। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে এই শিল্পচর্চা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় ঘরের কাজের ফাঁকে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা তৈরি করছেন। বাঁশবেত, তালপাতা ও উলের সাহায্যে তৈরি এসব পাখা স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতেও বিক্রি হচ্ছে। এই কাজ থেকেই তাঁর কিছু আর্থিক উপার্জনও হচ্ছে।
একসময় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ ছিল না বললেই চলে। তখন গরম থেকে স্বস্তি পেতে হাতপাখাই ছিল মানুষের একমাত্র ভরসা। তালপাতা, বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি এই পাখা শুধু শীতলতার উপকরণ নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের পরিবর্তনে বিদ্যুৎ ও ইনভার্টারের সহজলভ্যতায় হাতপাখার ব্যবহার অনেকটাই কমে গেলেও এর অবদান এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
রিনা দেবনাথ জানান, আগে হাতপাখার ব্যাপক চাহিদা ছিল। বর্তমানে সেই চাহিদা কমলেও গ্রামীণ এলাকার অনেক মানুষ এখনও হাতে তৈরি পাখা ব্যবহার করেন। বিশেষ করে উলের তৈরি নকশাদার পাখাগুলোর চাহিদা তুলনামূলক বেশি। সৌন্দর্য ও ব্যবহারিক সুবিধার কারণে এই ধরনের পাখা ক্রেতাদের আকর্ষণ করে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারেই তাঁর তৈরি পাখা বিক্রি হচ্ছে। পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি এই শিল্পের মাধ্যমে কিছু আয়ও হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় কাজটি আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন বলেও জানান তিনি।
রিনা দেবনাথের এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা নয়, বরং গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিকতার স্রোতে যখন বহু লোকঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পথে, তখন রিনার মতো মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলছে।
সচেতন মহলের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও বিপণনের সুযোগ তৈরি করা গেলে হাতপাখা তৈরির মতো কুটিরশিল্প আবারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তাতে যেমন সংরক্ষিত হবে বাংলার ঐতিহ্য, তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে গ্রামীণ এলাকায়।

