আগরতলা, ১২ অক্টোবর : মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে শামিল হল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। সোমবার বিরোধী ইন্ডি জোট ইন্ডি-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই ধর্না কর্মসূচিতে অংশ নেন ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশীষ কুমার সাহা এবং বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষা নিয়ে প্রতিবাদে সরব হন বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ।
দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। তবে এবার শুধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না বিরোধী ইন্ডি জোট। এই প্রতিবাদকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিকদের এই আন্দোলনে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সোমবার যন্তর মন্তরে ধর্নায় অংশ নিয়ে কংগ্রেস বিধায়ক তথা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সুদীপ রায় বর্মন জানান, এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতেই তাঁরা এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে শামিল হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। একের পর এক নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে কংগ্রেস।
সুদীপ রায় বর্মন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা আর শুধুমাত্র কোনও একটি রাজনৈতিক দলের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেও এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। সেই শর্ত লঙ্ঘিত হলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোই বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, বিরোধীদের এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে পরিণত করার লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে ইন্ডি জোটের নেতৃত্ব। সোমবার বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেন। ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও এই কর্মসূচিতে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির অংশগ্রহণকে তুলে ধরেছে।
একই দিনে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নটি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে দেশের সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
এই আন্দোলনের ধরনেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী জোট। জানা গেছে, এখন থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কোনও রাজনৈতিক দলের নিজস্ব পতাকা ব্যবহার করা হবে না। তার পরিবর্তে জাতীয় পতাকা বহন করা হবে। আন্দোলনকে দলীয় কর্মসূচির পরিবর্তে দেশের গণতন্ত্র রক্ষার বৃহত্তর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, চার দিনব্যাপী এই প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির নেতা-কর্মীরাই অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার আন্দোলনের পরিসর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গণতান্ত্রিক অধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের অধিকার রক্ষার দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছেন বিরোধী নেতৃবৃন্দ।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ এবং এসআইআর বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ আগামী দিনে কতটা বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের এই সরব অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের আবহ তৈরি করেছে।

