আগরতলা, ১ সেপ্টেম্বর : ত্রিপুরা ট্রাইব্যাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি)-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে আপাতত একক শক্তিতেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রদেশ কংগ্রেস। সরাসরি কোনও দলের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় না গিয়ে সাংগঠনিক শক্তির উপর নির্ভর করেই ভোটের ময়দানে নামতে চলেছে দলটি। তবে বিজেপি-বিরোধী সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলির জন্য নির্বাচনি সমঝোতার দরজা খোলা থাকবে বলে স্পষ্ট করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশীষ কুমার সাহা। তাঁর কথায়, কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ্যই হল বিজেপি-কে পরাজিত করা।
টিটিএএডিসি-র ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের তরফে নির্বাচনের নির্ঘন্ট সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে মনোনয়নপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। ফলে হাতে থাকা স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের প্রার্থী বাছাই এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলি।
এই পরিস্থিতিতে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে কংগ্রেসের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশীষ কুমার সাহা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কংগ্রেস কোনও দলের সঙ্গে সরাসরি নির্বাচনি সমঝোতায় না গিয়ে এককভাবেই অধিকাংশ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে যেসব আসনে কংগ্রেসের পক্ষে প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হবে না, সেখানে বিজেপি-বিরোধী সমমনোভাবাপন্ন দলগুলিকে সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
কংগ্রেস সভাপতির বক্তব্যে স্পষ্ট, ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে শুধুমাত্র স্থানীয় স্তরের নির্বাচন হিসেবে দেখছে না দলটি। এর মধ্য দিয়ে জনজাতি এলাকায় নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিজেপি-র বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করাই কংগ্রেসের অন্যতম লক্ষ্য। পাহাড়ে তিপ্রা মথা পরিচালিত প্রশাসন এবং সমতলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের প্রশাসন নিয়ে জনজাতি অংশের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলেও দাবি করেন আশীষ সাহা।
তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও অবাধ থাকলে কংগ্রেস ভালো ফল করতে পারে। তবে সেই ফলের জন্য সংগঠনকেই মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে প্রদেশ কংগ্রেস। বুথস্তর থেকে শুরু করে ভিলেজ স্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক শক্তি কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তার উপরই নির্বাচনে দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
এদিকে, বাম দলগুলির সঙ্গে সরাসরি নির্বাচনি সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। তবে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে স্থানীয় স্তরে সমন্বয়ের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি তিনি। অর্থাৎ, যেখানে কংগ্রেস শক্তিশালী, সেখানে নিজেদের প্রার্থী দিয়ে লড়াই এবং যেখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, সেখানে বিজেপি-বিরোধী সমমনোভাবাপন্ন প্রার্থীকে সমর্থনের কৌশল নিতে পারে কংগ্রেস।
অন্যদিকে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের নির্ঘন্ট ঘোষণা করায় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। আশীষ সাহা বলেন, দেরিতে হলেও নির্বাচন ঘোষণার সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে কোন দল কতগুলি আসনে প্রার্থী দিচ্ছে এবং কোথায় কোথায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে। ফলে ভিলেজ কমিটি নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ের রাজনৈতিক ময়দানে আগামী কয়েকদিনেই জোট-সমঝোতা, প্রার্থী বাছাই এবং আসনভিত্তিক কৌশল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
প্রসঙ্গত, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যের টিটিএএডিসি এলাকার ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটির সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা হবে ৫ অক্টোবর এবং সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ৮ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করা হবে। এবারের নির্বাচনে ৫২টি আর.ডি. ব্লকের অধীনে থাকা ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটির ২,৬৩৪টি নির্বাচনী ক্ষেত্রে মোট ৪,৫৯৭টি আসনের জন্য ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাজ্যের মোট ৫৮টি ব্লকের মধ্যে ৬টি ব্লকের অধীনে কোনও ভিলেজ কমিটি না থাকায় ওই ব্লকগুলিতে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন কমিশনার জানান, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ নির্বাচনী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। মনোনয়ন পত্র জমা দেবার শেষ দিন ৮ সেপ্টেম্বর। ৯ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্রগুলি পরীক্ষা বা স্কুটিনি করা হবে এবং ১১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। ২৮ সেপ্টেম্বর, সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কোনও কারণে পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন হলে ৩ অক্টোবর তা অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা শুরু হবে ৫ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে এবং গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে মোট ৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৯৭৭ জন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্যে ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ৪১ জন পুরুষ, ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার ৯৩০ জন মহিলা এবং ৬ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ভিলেজ কমিটি নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা ১ অক্টোবর, ২০২৫-কে যোগ্যতার তারিখ হিসেবে ধরে সংশোধিত বিধানসভার ভোটার তালিকা থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা ইতিমধ্যেই চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ভোটগ্রহণের জন্য মোট ১,৫৫০টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ধলাই জেলায় সর্বাধিক ২৯৯টি এবং উনকোটি জেলায় সর্বনিম্ন ৯২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ৮,৫০০ জন পোলিং পার্সোনেল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া ২৩১ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং ৩৭৩ জন সেক্টর অফিসার ইতিমধ্যে নির্বাচনী কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটগ্রহণকারী ব্লকগুলিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করা হবে। রাজ্যের আটটি জেলার জেলা শাসক ও সমাহর্তাদের জেলা নির্বাচন আধিকারিক এবং ৫২টি আর.ডি. ব্লকের বিডিওদের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার ও রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

