আগরতলা, ১৯ আগস্ট : প্রবীণ নাগরিকরা সমাজের বোঝা নন, তাঁরা সমাজের পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণা। তাঁদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, সত্যনিষ্ঠা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে অমূল্য সম্পদ। প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রত্যেকের। বুধবার অরবিন্দ ক্লাবের উদ্যোগে দেশের স্বাধীনতা দিবস ও ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রবীণ নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।
‘প্রবীণ নাগরিকরা সমাজের বোঝা নন, তাঁরা আমাদের পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণা’—এই বার্তাকে সামনে রেখে অরবিন্দ ক্লাবের পক্ষ থেকে এই সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অরবিন্দ ক্লাব দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। রক্তদান, বস্ত্রদানসহ নানা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ক্লাবটি সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করে আসছে। প্রবীণ নাগরিকদের সংবর্ধনা দেওয়ার এই উদ্যোগও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ডাঃ সাহা বলেন, এ ধরনের সামাজিক উদ্যোগ শুধু প্রবীণদের সম্মানিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়। রাজ্যের অন্যান্য সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও অরবিন্দ ক্লাবের এই উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রবীণদের সম্মান জানাতে এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি প্রতিটি পরিবার থেকেই শুরু হওয়া প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষই একদিন প্রবীণ হবেন। তাই প্রবীণদের অবহেলা বা অপাংক্তেয় করে রাখা কোনওভাবেই কাম্য নয়। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ ও নতুন প্রজন্মকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই ঐতিহ্যকে পাথেয় করেই আগামী দিনে এগিয়ে যেতে হবে। প্রবীণ নাগরিকদের যাতে কখনও বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা না হয়, সেদিকে পরিবার ও সমাজকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৭০ বছর ও তার ঊর্ধ্ব বয়সি নাগরিকদের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আয়ুষ্মান ভারত জন আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন। এর আওতায় পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে রাজ্য সরকারও মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা চালু করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সমাজে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের প্রয়োজনে অন্যজনকে পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও প্রত্যেককে কিছু না কিছু করে যেতে হবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তাঁদের জীবনের শিক্ষা নতুন প্রজন্মকে আরও মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
দেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে মোগল ও ব্রিটিশসহ বিভিন্ন বৈদেশিক শক্তি ভারত আক্রমণ করলেও দেশের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারেনি। ভারত তার ঐতিহ্যকে অটুট রেখেছে। এদেশে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও সকলেই এক ও অভিন্ন। এই ঐক্য ও সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে রাজ্য সরকার ত্রিপুরার পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। সরকারের কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখেই উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আগরতলা শহরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজধানী শহরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। বর্ষার সময়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জল জমার সমস্যা মোকাবিলায় পাম্পের মাধ্যমে দ্রুত জমা জল নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শহরবাসীর স্বার্থে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, পুর নিগমের সেন্ট্রাল জোনের চেয়ারপার্সন রত্না দত্ত, সমাজসেবী শ্যামল কুমার দেব, অরবিন্দ ক্লাবের কর্মকর্তা ও সদস্য-সদস্যাসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রবীণ নাগরিকদের সংবর্ধনা জানিয়ে তাঁদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
অরবিন্দ ক্লাবের এই উদ্যোগে প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে উৎসাহ ও আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সামাজিক জীবনে প্রবীণদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের প্রতি পরিবার ও সমাজের দায়িত্বের বিষয়টিও এদিনের কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষভাবে সামনে উঠে আসে।

