আগরতলা, ২৯ আগস্ট : মহারাজার আমল থেকেই ত্রিপুরায় জনজাতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ্রাস পেতে শুরু করেছিল। গত ৮১ বছর ধরে বিভিন্ন জনগণনার পরিসংখ্যানে সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। শনিবার আগরতলা প্রেসক্লাবে অ্যাসেম্বলি অব রিটায়ার্ড ট্রাইবেলস ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড স্কলার্স অব ত্রিপুরা (আর্টিস্ট)-এর উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনই দাবি করেন রাজ্য সরকারের প্রাক্তন আইন সচিব দাতা মোহন জমাতিয়া।
এদিনের সেমিনারের মূল বিষয় ছিল—‘এমপাওয়ারমেন্ট অব টিটিএএডিসি ইজ এ স্টেপ ফরওয়ার্ড টু দ্য প্রসেস অব ডেভেলপমেন্ট অব ট্রাইবালস ইন ত্রিপুরা’। জনজাতিদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আর্টিস্ট-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি)-এর ক্ষমতায়ন, গঠনপ্রণালী এবং জনজাতিদের সার্বিক উন্নয়নে কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রাক্তন আইন সচিব দাতা মোহন জমাতিয়া বিভিন্ন জনগণনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে ত্রিপুরায় জনজাতিদের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩১ সালের জনগণনায় ত্রিপুরায় জনজাতিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৭০.০৯ শতাংশ। ১৯৪১ সালের জনগণনায় তা কমে দাঁড়ায় ৬২.০৫ শতাংশে। ১৯৫১ সালে জনজাতিদের জনসংখ্যার হার আরও কমে হয় ৪৮.৬৫ শতাংশ। এরপর ১৯৬১ সালের জনগণনায় এই হার নেমে আসে ৩১.০৫ শতাংশে।
তিনি আরও জানান, ১৯৭১ সালের জনগণনায় রাজ্যে জনজাতিদের জনসংখ্যার হার ছিল ২৮.৪৬ শতাংশ। ১৯৮১ সালে তা সামান্য কমে ২৮.৪৪ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ১৯৯১ সালে জনজাতিদের অনুপাত কিছুটা বেড়ে ৩০.৯৫ শতাংশ হয়। ২০০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১.০৫ শতাংশ এবং ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনায় ত্রিপুরায় জনজাতিদের জনসংখ্যার হার ছিল ৩১.৭৮ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দাতা মোহন জমাতিয়া বলেন, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ত্রিপুরায় জনসংখ্যার বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মহারাজার আমলে ১৯৪৫-৪৬ সালে নোয়াখালীতে দাঙ্গার পর বহু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তৎকালীন মহারাজা ত্রিপুরায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। এর ফলে ত্রিপুরার জনসংখ্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে এবং রাজ্যের জনজাতিরা জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে শুরু করেন বলে তিনি দাবি করেন।
এদিনের সেমিনারে বক্তারা বলেন, ত্রিপুরার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে টিটিএএডিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে কাউন্সিলকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। টিটিএএডিসির হাতে অধিক ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক এবং আর্থিক অধিকার প্রদান করা হলে জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেন তাঁরা।
সেমিনারে টিটিএএডিসি কী, এর সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কী, কীভাবে টিটিএডিসি গঠিত হয় এবং কাউন্সিলের হাতে কী ধরনের অধিক ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি জনজাতিদের উন্নয়ন, অধিকার সংরক্ষণ এবং স্বশাসনের ক্ষেত্রে টিটিএএডিসির ভূমিকা নিয়েও বক্তারা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমীর দেববর্মা, চিকিৎসক সত্য রঞ্জন দেববর্মা, ধীরাজ দেববর্মা সহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য ও বিশিষ্টজনেরা। আলোচনায় ত্রিপুরার জনজাতি সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি, অতীতের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাব্য পথ নিয়ে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে।

