আগরতলা, ১৬ জুলাই : রাজ্যে স্থানীয়ভাবে ডিমের উৎপাদন কম থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই পাঞ্জাব ও অন্ধ্রপ্রদেশের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে ত্রিপুরাকে। বর্তমানে উৎসস্থলেই ডিমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজ্যের বাজারে। ফলে খুচরো বাজারে পোল্ট্রি ডিমের হালি (৪টি) ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
বাজারে মাছ ও মাংসের দাম দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তুলনামূলক সস্তা আমিষ হিসেবে পোল্ট্রি ডিমের উপর নির্ভরতা বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির জেরে সেই বিকল্প পথও এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে এক হালি ডিম ২৮ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। ফলে সংসারের খরচ সামাল দিতে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকা থেকেও ডিম কমাতে বাধ্য হচ্ছেন বহু পরিবার।
ডিমের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে আগরতলার মহারাজগঞ্জ বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, ত্রিপুরায় ডিম উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় বাইরের রাজ্যের উপর নির্ভর করতেই হয়। বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ ও পাঞ্জাব থেকেই অধিকাংশ ডিম আমদানি করা হয়। সম্প্রতি ওই রাজ্যগুলিতে ডিমের পাইকারি মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে ত্রিপুরার বাজারেও।
ব্যবসায়ীদের দাবি, উৎসস্থলে প্রতি কার্টন ডিমের দাম প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রতি পাতা ডিমে প্রায় ৩০ টাকা এবং প্রতি হালিতে প্রায় ৪ টাকা করে দাম বেড়েছে। তবে এই হিসাব পাইকারি বাজারের। খুচরো পর্যায়ে পরিবহণ খরচ, মজুরি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের আরও বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।
মহারাজগঞ্জ বাজারের জনৈক ডিম ব্যবসায়ী বলেন, “আমরাও বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছি। বাইরে থেকে বেশি দামে ডিম কিনে এনে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। পাইকারি দামে যেভাবে বৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রভাব খুচরো বাজারে পড়াটাই স্বাভাবিক।”
অন্যদিকে, রাজ্যে পোল্ট্রি খাতের বিকাশ এবং ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট দফতরের ভূমিকা নিয়েও। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, পশুপালন দফতর স্থানীয় খামারিদের পর্যাপ্ত উৎসাহ, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ডিম উৎপাদনে আত্মনির্ভর হওয়ার পরিবর্তে রাজ্যকে এখনও বহিঃরাজ্যের উপর নির্ভরশীল অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, দফতরের তরফে নিয়মিত রাজ্য, জেলা ও মহকুমা স্তরে পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তার বাস্তব প্রভাব মাঠপর্যায়ে তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। প্রতি মাসে একাধিক বৈঠক ও পর্যালোচনার পরও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না আসায় ক্ষোভ বাড়ছে খামারিদের মধ্যেও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পোল্ট্রি শিল্পকে শক্তিশালী করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের ভর্তুকি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতেও ডিমের বাজারে এই ধরনের মূল্য অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। একসময় স্বল্প খরচে আমিষের চাহিদা মেটানো যে খাদ্যপণ্যটি ছিল, সেটিই এখন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

