চুড়াইবাড়ি, ১৩ জুন : ত্রিপুরার রাজনৈতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল শনিবার। সিপিআই(এম)-এর বর্ষীয়ান নেতা, আটবারের বিধায়ক এবং রাজ্যের প্রাক্তন বনমন্ত্রী ফয়জুর রহমানের শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে উত্তর ত্রিপুরা জেলা থেকে শুরু করে সমগ্র রাজ্যের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শনিবার রাত প্রায় ১টায় উত্তর ত্রিপুরা জেলার লালছড়াস্থিত নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৪ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন কন্যা, দুই পুত্রসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং অনুরাগী রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রশাসনিক আধিকারিক, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষ তাঁর বাসভবনে ছুটে আসেন। শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার কারণে তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।
শনিবার বিকেল ৩টায় তাঁর বাসভবনের সম্মুখবর্তী মাঠে ত্রিপুরা পুলিশ ও টিএসআর (ত্রিপুরা স্টেট রাইফেলস)-এর জওয়ানরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও জনসেবামূলক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে ধর্মীয় রীতি মেনে জানাজা নামাজ আদায়ের পর তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর জেলার জেলাশাসক চাঁদনী চন্দ্রন, অতিরিক্ত জেলাশাসক দেবযানী চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কমল দেববর্মা, কদমতলা-কুর্তি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ইসলাম উদ্দিন, বাগবাসা বিধানসভার বিধায়ক যাদব লাল নাথ, যুবরাজনগর বিধানসভার বিধায়ক শৈলেন্দ্র চন্দ্র নাথ, জেলা বিজেপি নেতৃত্ব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ।
এদিন জেলাশাসক চাঁদনী চন্দ্রন বলেন, “সমস্ত প্রশাসনিক নিয়মকানুন মেনে এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রী ফয়জুর রহমানকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”
অপরদিকে, কদমতলা-কুর্তি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ইসলাম উদ্দিন তাঁর শোকবার্তায় বলেন, “ফয়জুর রহমান ছিলেন এই অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় জননেতা। দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি বিধায়ক হিসেবে জনগণের সেবা করেছেন। বনমন্ত্রী, সিপিআই(এম)-এর রাজ্য কমিটির সদস্য এবং ত্রিপুরা ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, এই এলাকার মানুষের অভিভাবক ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।”
উল্লেখ্য, ফয়জুর রহমান ত্রিপুরার রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং জনমুখী নেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক এবং নিরলস জনসেবার জন্য তিনি রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে সর্বমহলে সম্মান অর্জন করেছিলেন।
তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটেনি, বরং উত্তর ত্রিপুরার জনজীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর স্মৃতি ও অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

