আগরতলা, ৬ নভেম্বর : দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কলেজের সেমিস্টার ফি জোগাড় করতে পরিবারের শেষ সম্বল বলতে নিজের বাড়ির হাঁস-মুরগি বিক্রি করেছিলেন। কষ্ট করে জমানো সেই ১৫ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে আগরতলায় আসার পথেই ঘটে বিপত্তি। হারিয়ে যায় টাকাভর্তি ব্যাগ। মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে পড়ে তাঁর সমস্ত স্বপ্ন। কান্নায় ভেঙে পড়েন অসহায় ছাত্রী। কিন্তু বিপদের সেই মুহূর্তে অপরিচিত মানুষের মধ্যেই খুঁজে পেলেন আপনজন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার অনন্য নজির গড়লেন আগরতলার নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক ও মালিকপক্ষ।
জানা গেছে, অমরপুরের দরিদ্র পরিবারের ছাত্রী মিনা জমাতিয়া পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল ইসলাম কলেজে পড়াশোনা করেন। কলেজের সেমিস্টার ফি জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল মোটা অঙ্কের টাকা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেই টাকা জোগাড় করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়ির হাঁস-মুরগি বিক্রি করে প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ টাকা কলেজের সেমিস্টার ফি বাবদ নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। বাকি টাকা ছিল অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য।
সেই টাকা সঙ্গে নিয়েই আগরতলার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন মিনা। কিন্তু আগরতলায় পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। জানা যায়, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া চাইলে ব্যাগ খুলে ভাড়া দেন তিনি। এরপর নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে ব্যাগ খুলতেই তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। দেখতে পান, ব্যাগে রাখা টাকার পুঁটলিটি আর নেই। কোথায়, কখন কীভাবে টাকা হারিয়ে গেল, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিবারের অসহায় অবস্থা এবং হাঁস-মুরগি বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের সেই কঠিন মুহূর্ত। কলেজের সেমিস্টার ফি কীভাবে জমা দেবেন, কীভাবেই বা আবার টাকা জোগাড় করবেন—এই দুশ্চিন্তায় কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন মিনা। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর কাছে ওই ১৫ হাজার ৮০০ টাকা নিছক অর্থ ছিল না, ছিল পরিবারের কষ্ট, ত্যাগ এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে মিনা নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক ও মালিকপক্ষের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছাত্রীর মুখে সমস্ত ঘটনা শোনার পর তাঁর অসহায়তার বিষয়টি উপলব্ধি করেন বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা। এরপর আর্থিক সংকটে থাকা ওই ছাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। নিজেদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে মিনার হাতে তুলে দেন কলেজের সেমিস্টার ফি-সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের টাকা।
অচেনা শহরে এসে সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় যখন এক ছাত্রী কার্যত দিশেহারা, তখন নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক ও মালিকপক্ষের এই সহযোগিতা তাঁর কাছে যেন অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলোর দিশা হয়ে দেখা দেয়। তাঁদের এই উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছেন মিনা জমাতিয়া। হারিয়ে যাওয়া টাকার কারণে যাতে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে না যায়, সেই আশঙ্কা অনেকটাই দূর হয়েছে এই সহযোগিতায়।
বর্তমান সময়ে যেখানে সামান্য স্বার্থের সংঘাতেও মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, সেখানে নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক ও মালিকপক্ষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী মানবিক দৃষ্টান্ত। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যে প্রকৃত মনুষ্যত্ব, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন তাঁরা। একজন অসহায় ছাত্রীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে তাঁদের এই সহযোগিতা শুধু প্রশংসনীয়ই নয়, সমাজের কাছে এক ইতিবাচক বার্তাও বহন করে।

