তেলিয়ামুড়া, ৮ মে : “আমার শরীরে আর শক্তি নেই… তাই অপমান সহ্য করেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে…” — কথাগুলি বলতে বলতেই বারবার গলা ধরে আসছিল ৮৮ বছরের বৃদ্ধা সন্ধ্যা রানি চক্রবর্তীর। চোখের কোণে জমে থাকা জল যেন তাঁর অসহায়তারই নীরব সাক্ষী। চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু অভিযোগ, সেখানে চিকিৎসার বদলে জুটেছে অপমান, অবহেলা আর তাচ্ছিল্য!
ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতাল চত্বরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তথা মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিক রাজা জমাতিয়া। বৃদ্ধার দাবি, বার্ধক্যজনিত একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। সেই কারণেই সকাল থেকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের দেখার অপেক্ষা করেন। কিন্তু বহু কষ্টে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করার পর তাঁর সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
সন্ধ্যা রানি চক্রবর্তীর অভিযোগ, তিনি নিজের অসুস্থতার কথা বলতে শুরু করতেই চিকিৎসক বিরক্তি প্রকাশ করেন। এমনকি কথা শেষ করার সুযোগও না দিয়ে উচ্চস্বরে তাঁকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে অপমানজনক ভাষায় ভর্ৎসনাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ বৃদ্ধার।
কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি বলেন,“আমি তো আর আগের মতো শক্তি রাখি না। শরীরও ভালো নেই। তাই কোনও প্রতিবাদ না করেই চুপচাপ বেরিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে যদি রোগীদের সঙ্গেই এমন ব্যবহার হয়, তাহলে আমাদের মতো বৃদ্ধ মানুষ কোথায় যাব?”
ঘটনার পর হাসপাতাল চত্বরেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। সেখানেও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি বৃদ্ধা। তাঁর কথায়, একজন চিকিৎসক মানেই রোগীর কাছে ভরসার শেষ ঠিকানা। সেখানে যদি অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষকে অপমানিত হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। সরকারি হাসপাতালেই ভরসা করে আসি। কিন্তু এখানেও যদি অপমান সহ্য করতে হয়, তাহলে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে যাবে।”
এদিকে, স্থানীয়দের একাংশের দাবি, চিকিৎসক রাজা জমাতিয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এক রোগীর আত্মীয় অভিযোগ করে বলেন, দূরদূরান্ত থেকে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীকেই নাকি বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত চেম্বারে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর এবং তেলিয়ামুড়া বিধানসভার বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায় এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু হাসপাতালের অভ্যন্তরে যদি রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই সমস্ত উদ্যোগের ভাবমূর্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

